জাতীয় ডেস্ক | বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | 4 বার পঠিত

দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সন্তানের মতো লালন-পালন করা ৫৬ মণের ষাঁড় ‘মানিক’ শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে টাঙ্গাইলের নারী খামারি হামিদা আক্তারের জীবনে। তবে শুধু বিক্রিই নয়, বিশালাকৃতির এই গরুর মাংস এবার ঈদের তৃতীয় দিনে এতিম, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ভেঙ্গুলার গ্রামের হামিদা আক্তার প্রায় এক যুগ ধরে ‘মানিক’কে পরম মমতায় বড় করেছেন। এই গরুটি ঘিরে ছিল তার অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। গত ঈদে কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন তিনি। একজন ক্রেতা ১৫ লাখ টাকা দামও বলেছিলেন। কিন্তু পরে আর ফিরে আসেননি। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে আরও এক বছর গরুটি লালন-পালন করেন হামিদা। এবারের ঈদেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। একজন ১৮ লাখ টাকা দাম চূড়ান্ত করেও শেষ পর্যন্ত আর গরু নিতে আসেননি। এতে ভালোবাসার ‘মানিক’ ধীরে ধীরে হামিদার জন্য ঋণের বোঝায় পরিণত হয়।
জানা গেছে, বিশালদেহী গরু ‘মানিক’-কে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল হয়েছেন। লাইক-ভিউ পেয়েছেন, আয়ও করেছেন। কিন্তু ক্যামেরার পেছনে থাকা সংগ্রামী নারী হামিদার কষ্ট, দুশ্চিন্তা আর অসহায়ত্বের পাশে দাঁড়ায়নি কেউ।
ঠিক এমন সময় আশার আলো হয়ে এগিয়ে আসেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন ন্যায্যমূল্যে গরুটি কিনে নেয়। এতে ঋণের চাপ কিছুটা কমিয়ে স্বস্তি ফিরে পান হামিদা। বর্তমানে ‘মানিক’কে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগরে ফাউন্ডেশনের খামারে বিশেষ যত্নে রাখা হয়েছে। ঈদের তৃতীয় দিনে গরুটি কোরবানি করে এতিম, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে রান্না করা মাংস বিতরণ করা হবে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের পাকা ঘরে রাখা হয়েছে ‘মানিক’-কে। মাথার ওপর ঘুরছে ফ্যান। শান্ত স্বভাবের বিশালদেহী গরুটিকে একনজর দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।
খামারের কর্মচারী রেহেনা বেগম বলেন, ‘গত সোমবার টাঙ্গাইল থেকে গরুটি আনা হয়েছে। উন্নতমানের খাবার দিয়ে যত্ন নেওয়া হচ্ছে। ঈদের পর এতিমদেরকে খাওয়ানো হবে।’
মোবাইল ফোনে কথা হয় খামারি হামিদা আক্তারের সঙ্গে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘আমার এতোটুকুই লাভ হয়েছে যে কিছু ঋণ শোধ করতে পারছি। সবসময় চেয়েছি ভালো মানুষের কাছেই মানিককে বিক্রি করবো। কোনো ব্যাপারী বা কসাইয়ের কাছে দিতে চাইনি। ভালো মানুষের কাছে বিক্রি করতে পেরে এখন শান্তি লাগছে।’
তিনি জানান, ‘দুই বছর আগে গরুটির ওজন ছিল প্রায় ২ হাজার ৮০ কেজি। গত বছর ১৫ লাখ ও এ বছর ১৮ লাখ টাকার প্রস্তাব পেয়েও শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রির ইচ্ছে ছিল। শেষ মুহূর্তে আর ক্রেতা না পাওয়ায় ১১ লাখ ২০ হাজার টাকায় গরুটি বিক্রি করেন।’
হামিদা বলেন, ‘১০ বছর ধরে নিজের সন্তানের মতো পালন করছি। প্রতিদিন ১০ হালি বিচি কলা, ৪ কেজি বুট, ভূষি আর এক কেজি আতপ চালের ভাত খাওয়াই। এত খরচের অর্ধেকও উঠেনি। এখনও প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ আছে।’
তিনি আরও জানান, ‘২০২৪ সালে অনার্সে পড়াকালে তাঁর মা মারা যান। পরিবারে রয়েছেন ছোট বোন ও বৃদ্ধ বাবা। বর্তমানে মাস্টার্সে পড়াশোনার পাশাপাশি বিকাশের দোকান এবং খামারের কাজ সামলাচ্ছেন। ভবিষ্যতে সফল খামারি হয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি।’
আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম বলেন, ‘অনলাইনে নারী উদ্যোক্তা হামিদার অসহায়ত্ব প্রকাশ পেলে তাঁর স্বপ্ন পূরণের সারথি হন দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ। বছরের পর বছর বুকে পাথর চেপে রাখা যে মানুষগুলোর পাতে এক টুকরো ভালো খাবার জোটেনি। সেই মলিন মুখগুলোতে একটুখানি পরম তৃপ্তির হাসি ফোটাতে ঈদের তৃতীয় দিন গরুটিকে রান্না করে খাওয়ানো হবে।’
Posted ৩:৪৬ পিএম | বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।